৬ বছরে ৭০ মামলা, কারও সাজা হয়নি

বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গত ছয় বছরে রাজধানীতে দায়ের হওয়া ৭০টি মামলার একটিও এখন পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। শাস্তি পাননি কোনো অপরাধী। মামলা থেকে অব্যাহতি ও খালাস পেয়ে গেছেন অনেকে। অনেক আসামি জামিন নিয়ে আর আদালতে হাজিরা দিতেও যাচ্ছেন না।

ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত থেকে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনে’ দায়ের করা এই ৭০টি মামলার নথি পর্যালোচনা করে এসব তথ্য মিলেছে। মামলাগুলোর বিষয়ে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তা হলো, ‘অভিযোগ গঠনের উপাদান না পাওয়ায় আসামিদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।’
অন্তত ১০টি মামলার অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেখানে এজাহারের অভিযোগের বাইরে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই ১০ মামলার প্রায় ৪০ আসামির মধ্যে ৩৪ জন অব্যাহতি পেয়েছেন। আর একটি মামলার দুই আসামি খালাস পেয়েছেন। সাতটি মামলা প্রমাণ করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। নয়টি মামলা তদন্তাধীন। বাকি ৪৩ মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলছে। তবে অধিকাংশ আসামি ও সাক্ষী আদালতে আসছেন না। তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
৭০টি মামলার মধ্যে শেরেবাংলা নগর থানায় ১০টি, লালবাগ ও নিউমার্কেট থানায় ১১টি করে, মোহাম্মদপুরে সাত, রমনায় ছয়, শাহবাগে পাঁচ, চকবাজার-মতিঝিল থানায় চারটি করে, কোতোয়ালি, ওয়ারী ও বংশাল থানায় তিনটি করে, কলাবাগানে দুটি আর কাফরুল থানায় একটি মামলা হয়েছে। বেশির ভাগ মামলা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও জালিয়াতির অভিযোগে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দেওয়া হয়েছে। সব মামলার তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে। তদন্তে যাতে কোনো প্রকার ফাঁক না থাকে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইজিপিকে বলব।’
নামমাত্র তদন্ত ও দুর্বল অভিযোগপত্র: ২০১১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে মোহাম্মদপুর ও শ্যামলী থেকে মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে র্যা ব। পরদিন তাঁদের বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন র্যা বের এক কর্মকর্তা। দুই মাস তদন্তের পর অভিযোগপত্র দাখিল করেন র্যা বের সহকারী পুলিশ সুপার নূর-ই-আলম। ‘অভিযোগ গঠনের উপাদান না পাওয়ায়’ এর মধ্যেই মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত ১৯ আসামির মধ্যে ১৭ জনকেই অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। এখন মাত্র দুজনের বিচারকাজ চলছে। এঁদের একজন জসিমউদ্দীন জামিন পেয়ে আর আদালতে হাজিরা দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে এক বছর আগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। তারপরও তাঁকে আদালতে হাজির করতে পারেনি পুলিশ। শেষ পর্যন্ত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে আবারও র্যা বের হাতেই গ্রেপ্তার হন এই জসিমউদ্দীন।
বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, ১১ মামলায় সব আসামি অব্যাহতি
মামলাটির অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর এজাহার আর অভিযোগপত্রের বর্ণনায় বিশেষ কোনো তফাৎ নেই। শুধু এজাহারে উল্লেখিত দুজন আসামিকে অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই দুজন হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ফিরোজুল ইসলাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফেরদৌস আহমেদ ওরফে এমিল। অব্যাহতির কারণ সম্পর্কে অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে ওই দুজন তাঁদের কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ভিড় দেখে কৌতূহলবশত এগিয়ে গেলে র্যা ব তাঁদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু র্যা বের ভাষ্যমতে, অভিযানটি চালানো হয়েছে রাত আড়াইটায়। এত রাতে তাঁরা কোন কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন, সে বিষয়টি অভিযোগপত্রে স্পষ্ট করা হয়নি। এ ছাড়া অভিযোগপত্রে ১৯ আসামির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেসবের কোনোটিই প্রমাণ করার চেষ্টা হয়নি। অভিযোগগুলোর বিশদ ব্যাখ্যাও নেই সেখানে। শুধু মামলার এজাহারে উল্লেখিত অভিযোগ ও বর্ণনা অভিযোগপত্রে জুড়ে দেওয়া রয়েছে।
মামলার এজাহারে আসামিদের কাছ থেকে ছয় পৃষ্ঠার কাগজে যে ৮৮টি প্রশ্ন পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযোগপত্রে সেই প্রশ্নটিকেই ‘ভর্তি পরীক্ষার সাদৃশ্য প্রশ্নপত্র’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ৮৮টি প্রশ্ন থেকে কতগুলো প্রশ্ন পরদিন অনুষ্ঠিত ভর্তি পরীক্ষায় এসেছিল, সেটিও যাচাই করেননি তদন্ত কর্মকর্তা। ফাঁস হওয়া সেই প্রশ্ন কাদের মাধ্যমে আসামিদের হাতে এল, তাঁরা এটা কাদের কাছে বিক্রি করেছেন, এসব কিছুই খতিয়ে দেখা হয়নি। অভিযোগপত্রে এসবের কোনো উল্লেখও নেই।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মামলার অভিযোগপত্র দাখিলকারী র্যা বের তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার নূর-ই-আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও র্যা বের সদর দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মামলার বাদী র্যা বের উপসহকারী পরিচালক লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এখন আর তিনি র্যা বে কাজ করছেন না। তাঁর কাছেও নূর-ই-আলমের ঠিকানা নেই।
ওই মামলায় জামিন পেয়ে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আবারও প্রশ্ন ফাঁসের ব্যবসায় জড়ান জসিমউদ্দীন। সর্বশেষ এ মাসের ১৫ তারিখ রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএস থেকে আবারও গ্রেপ্তার হন তিনি। র্যা বের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান প্রথম আলোকে বলেন, সেদিন গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের দলটির মূল হোতা এই জসিমউদ্দীন। তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী দাবি করলেও প্রশ্ন ফাঁসের কারবার করে ইতিমধ্যে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন। তিনি পরীক্ষার দু-একদিন আগে প্রশ্ন ফাঁস করে আগ্রহী পরীক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করেন। তবে তিনি কার কাছ থেকে, কীভাবে প্রশ্ন সংগ্রহ করেন সেই তথ্য এখনো অজানা। পরপর দুবার গ্রেপ্তার হলেও সেই রহস্য বের করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
র্যা ব কর্মকর্তা মুফতি মাহমুদ বলেন, জসিমের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া অন্যদের মধ্যে এ জেড এম সালেহীন ওরফে শোভন চিকিৎসক ও মেডিকেল ভর্তি কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত। এস এম সানোয়ার ‘ই-হক কোচিং সেন্টার’-এর সঙ্গে জড়িত। এঁরা দুজন ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পাস করিয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তি করেন। পরে জসিম শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছ থেকে ন্যূনতম ১২ লাখ টাকার চেক ও শিক্ষার্থীদের আসল সনদগুলো নিয়ে রাখতেন। যাতে শিক্ষার্থীরা মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেলে তাঁদের অভিভাবকেরা টাকা নিয়ে টালবাহানা করতে না পারে। চক্রটির কাছ থেকে ১ কোটি ২১ লাখ টাকার ১৩টি চেক উদ্ধার করা হয়েছে।
এ মামলাটি তদন্ত করছে কাফরুল থানার পুলিশ। থানা পুলিশ এখনো নিশ্চিত হয়নি যে, তাদের কাছে পাওয়া কথিত মডেল প্রশ্ন থেকে আসল পরীক্ষায় কোনো প্রশ্ন এসেছিল কি না। কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার মো. শামীম হোসেন বলেন, এ ঘটনায় রাশেদ খান মেনন নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ওই মামলায় গ্রেপ্তার হলেন পাঁচজন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা সবাই এখন কারা হেফাজতে। তিনি বলেন, তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার করা প্রশ্নপত্র এখনো যাচাই করে দেখা হয়নি, তবে তদন্ত চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগপত্রে বিস্তারিত বৃত্তান্ত না থাকলে এবং সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হলে অভিযুক্তরা সুযোগ পেয়ে যান, তাঁদের পক্ষে মামলা থেকে খালাস পাওয়া সহজ হয়। তিনি বলেন, পুলিশের কাজ তো শুধু গ্রেপ্তার করা না। অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীরা আদালতে যেন দোষী প্রমাণিত হয়, তার জন্য সব রকম ব্যবস্থা নেওয়াও পুলিশের দায়িত্ব। তাঁর মতে, রাজনৈতিক নিয়োগ, নিয়োগ-বাণিজ্য ও অন্যান্য দুর্নীতির কারণে পুলিশের দক্ষতা অনেক কমেছে। ফলে ফৌজদারি মামলার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছেন।
অব্যাহতির আরও নমুনা: গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার দিনে মুঠোফোনের খুদে বার্তার মাধ্যমে জালিয়াতি করার অভিযোগে রাফিয়া হাসান নামে একে ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করে নিউমার্কেট থানার পুলিশ। ওই ঘটনার এজাহারে জালিয়াতির মূল হোতা হিসেবে তুহিন নামের এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ থাকলেও তদন্তে তুহিন বা সেই চক্রের কোনো সূত্রই বের করতে পারেনি পুলিশ। এজাহারের বিবরণগুলোই তুলে দিয়ে মামলার অভিযোগপত্র দেয় নিউমার্কেট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুর রহিম। পরে আদালত আসামিকে অব্যাহতি দিয়ে আদেশে উল্লেখ করেন, এজাহারে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন থেকে খুদে বার্তার মাধ্যমে অসাধু উপায়ে পরীক্ষা দেওয়া। আসামির মোবাইল সেটটি জব্দ করা হয়। কিন্তু খুদে বার্তায় কী ছিল, তা এজাহারে বলা নেই। তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত করে এ বিষয়ে কী পেয়েছেন অর্থাৎ খুদে বার্তায় কী ছিল, তা পুলিশ প্রতিবেদনেও নেই। তাই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের সুনির্দিষ্ট উপাদান না থাকায় রাফিয়াকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তের দুর্বলতার কারণে আসামি অব্যাহতি পেয়ে যাচ্ছেন, এটা খুবই উদ্বেগজনক। কেন, কী কারণে আসামিরা অব্যাহতি পাচ্ছেন, সে বিষয়ে তদন্ত হওয়া জরুরি।

মন্তব্যসমূহ